সাতকানিয়া মক্কার বলীখেলা ২০ এপ্রিল, জেনে নিন ইতিহাস…..

258

দক্ষিণ চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সাতকানিয়ার ‘মক্কার বলী খেলা’ আগামী ২০ এপ্রিল (৭ বৈশাখ) শুক্রবার অনুষ্ঠিত হবে। বলী খেলা উপলক্ষে সাতকানিয়ার মাদার্শা মক্কার বাড়ির আশপাশে বিশাল এলাকাজুড়ে বসবে বৈশাখী মেলা। সকাল থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত চলবে মেলার কার্যক্রম। মেলায় মিলবে প্রয়োজনীয় সকল জিনিসপত্র।

বলী খেলা এবং বৈশাখী মেলাকে কেন্দ্র করে এলাকার লোকজনের মাঝে এখন থেকে বিরাজ করছে বাড়তি আনন্দ-উৎসাহ। আয়োজকরা জানিয়েছেন, এবছর ১৩৯ তম বলী খেলা অনুষ্ঠিত হবে। খেলা সুষ্ঠু ও সুন্দর ভাবে সম্পন্ন করতে জোর প্রস্তুতি চলছে। ইতিমধ্যে দেশের নামকরা বলীদের সাথে যোগাযোগ করে খেলায় তাদের উপস্থিত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে বলে জানিয়েছেন মেলা কর্তৃপক্ষ।

সাতকানিয়ার মাদার্শা মক্কার বাড়ির বংশধর, স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও চট্টগ্রাম ইসলামিয়া কলেজের অধ্যাপক ড. আবুল আলা মুহাম্মদ হোছামুদ্দিন বলেন, এখন থেকে তিন শতাধিক বছর পূর্বে তাদের পূর্ব পুরুষ সৌদিয়া আরবের মক্কার বাসিন্দা ইয়াছিন মক্কী ধর্ম প্রচারের উদ্যোশে সাতকানিয়ায় আসেন এবং মাদার্শার পাহাড়ি এলাকায় বসবাস শুরু করেন।

এরপর থেকে এলাকাটি মক্কা বাড়ি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ইয়াছিন মক্কী এলাকায় ধর্ম প্রচারের পাশাপাশি কিছু ব্যবসাও শুরু করেন। হজ্ব মৌসুমে তিনি বাংলাদেশের অনেক হাজীকে হজ্ব করানোর জন্য সৌদিয়া আরবে নিয়ে যেতেন। এক সময় তিনি সাতকানিয়ার মাদার্শা এলাকায় স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেন। সে সুবাদে সাতকানিয়া ছাড়াও চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে তিনি বিপুল পরিমান জায়গা কিনে নেন। বিয়েও করেছেন বাংলাদেশ থেকে। ইয়াছিন মক্কী এক হজ্ব মৌসুমে বাংলাদেশ থেকে বেশ কিছু হাজী নিয়ে সৌদিয়া আরবে যান এবং সেখানে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর ইয়াছিন মক্কীর পরবর্তী প্রজন্ম জমিদারি প্রথা চালু করেন। ১৮৭৯ সালে ইয়াছিন মক্কীর নাতি কাদের বক্সু চৌধুরী খাজনা দিতে আসা প্রজা এবং এলাকার লোকজনকে আনন্দ দেয়ার উদ্যোশে সর্ব প্রথম বলী খেলার আয়োজন করেন। এরপর থেকে এটি মক্কার বলি খেলা নামে পরিচিত লাভ করেন।

কাদের বক্স এর নাতি ও বর্তমানে মক্কার বলী খেলার মূল আয়োজক নাজমুল আলম চৌধুরী বলেন, আমার দাদা মূলত খাজনা দিতে আসা লোকজন এবং এলাকার মানুষকে আনন্দ দেয়ার জন্য বলীখেলার আয়োজন করতেন। প্রতি বছর বৈশাখ মাসের ৭ তারিখে সবাই দল বেঁধে খাজনা দিতে আসতেন। ওই দিন মক্কার বাড়ি এলাকায় খাজনা দিতে আসা লোকদের ভিড় জমে যেতো। আমার দাদা খাজনা দিতে আসা লোকদের জন্য মেজবানের আয়োজন করতেন। খাজনা প্রদানকারী এবং এলাকার মানুষকে বাড়তি আনন্দ দিতে বলী খেলার আয়োজন করতেন। শুরুর দিকে বাড়ির সামনে বিশালাকৃতির একটি গাছের টুকরো রাখতেন।

খাজনা দিতে আসা এবং স্থানীয় লোকদের মধ্য থেকে যারা ওই গাছের টুকরো উপরে তুলতে পারতেন তারাই কেবল বলী খেলার উপযোগী হিসেবে বিবেচিত হতেন। গাছের টুকরো ওঠানো যারা বলী ধরার যোগ্যতা অর্জন করতেন তাদের মধ্যে মূল প্রতিযোগিতা হতো এবং বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার দিতেন। গাছের টুকরো তুলে প্রাথমিক যোগ্যতা অর্জনকারীরা বলীখেলায় হেরে গেলেও তাদের মাঝে শান্তনা পুরস্কার বিরতণ করতেন। এভাবে চলতে চলতে মক্কার বলীখেলা এক পর্যায়ে এলাকার মানুষের আনন্দের মূল কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়। সাতকানিয়া ছাড়াও দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থান থেকে বলী খেলা দেখতে উৎসুক জনতা মক্কার বাড়ি এলাকায় ভিড় জমান। এরপর থেকে বলী খেলা উপলক্ষে মেলার আয়োজন শুরু হয়।

নাজমুল আলম চৌধুরী আরো জানান, আমার দাদা যেহেতু বৈশাখের ৭ তারিখে খেলার আয়োজন করতেন আমরাও একই তারিখে বলী খেলা এবং মেলার আয়োজন করি। কোন ধরনের প্রচার প্রচারণা হীন এই মক্কার বলী খেলায় চট্টগ্রাম ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অসংখ্য লোক খেলা দেখতে ছুঁটে আসেন। বলী খেলা উপলক্ষে মক্কার বাড়ির আশপাশে কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বসবে বৈশাখী মেলা। মেলার আগের দিন থেকে দোকানীরা নানা পন্যের পসরা সাজিয়ে বসেন। সেখানে খাবার, কাপড়-চোপড়, কসমেটিকসের দোকান ছাড়াও বাঁশ-বেতের তৈরি জিনিসপত্র, নানা কৃষি উপকরণসহ গ্রামীণ পরিবারে সারা বছরের প্রয়োজনীয় যাবতীয় সামগ্রী মেলায় পাওয়া যায়। লোকজন বলী খেলা উপভোগের পাশাপাশি মেলা থেকে ব্যবহারের সব জিনিসপত্রও কিনে নেন।

তিনি আরো জানান, বৈশাখ মাসের ৭ তারিখে সকাল থেকে মেলায় কেনা-কাটা হলেও বলী খেলা শুরু হয় মূলত বিকালে। সমস্ত মেহমান এবং দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা বলীদের খাবারের পর দুপুর আড়াই টার দিকে মক্কার বাড়ির লোকজন হলুদ রঙের বিশাল আকৃতির ছাতা মাথায় দিয়ে বাদ্য-বাজনা বাজিয়ে মাঠে প্রবেশের পর শুরু হয় বলী খেলার মূল কার্যক্রম। মক্কার বাড়ির লোকজন মাঠে উপস্থিত হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা নামকরা বলীরা খালি গায়ে বাজনার তালে তালে নিত্য করে মাঠের চার পাশে কয়েক বার ঘুরে শক্তি প্রদর্শন করবে। ততক্ষনে মেলায় আসা লোকজনের মধ্য থেকে খেলায় অংশ নেয়ার আগ্রহী বলীদেরকে মাঠের মাঝখানে ডেকে নিয়ে আসে। শুরুর দিকে স্থানীয় বলীরা খেলায় অংশ নেবে এবং ধাপে ধাপে বিভিন্ন স্থান থেকে আসা সুঠম দেহের নামকরা বলীরা খেলা শুরু করে। এবারে ক্সবাজারের রামুর দিদার বলী, উখিয়ার শমসু বলী, টেকনাফের আলম বলী, খুলনার শিপন বলী, যশোরের কামাল বলীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নামকরা বলীরা খেলায় অংশ নেবেন বলে জানান।

মাদার্শা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আ ন ম সেলিম উদ্দিন বলেন, মক্কার বাড়ির বলী খেলা পুরো চট্টগ্রামের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী। বলী খেলা উপলক্ষে মক্কার বাড়ির আশপাশে বিশাল মেলা বসে। কোন ধরনের প্রচারণা ছাড়া এই বলী খেলা ও বৈশাখী মেলায় লাখো মানুষের ঢল নামে। দক্ষিণ চট্টগ্রাম ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা লোকজন বলী খেলা উপভোগ করার পাশাপাশি মেলা থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে নেন।

তিনি আরো জানান, বলী খেলা উপলক্ষে স্থানীয় লোকজনের মাঝে এখন থেকে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে। মক্কার বলী খেলাকে ঘিরে এখানকার ঘরে ঘরে চলবে উৎসবের আমেজ। প্রতিবছর বলী খেলা উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা ছেলে মেয়ে ও আত্মীয়-স্বজনরা সবাই বাড়িতে বেড়াতে আসবে। এক সময় মাদার্শা মক্কার বাড়ি এবং আশপাশের এলাকায় মেয়ের বিয়ের সময় বর পক্ষের সাথে অন্যান্য কথা বার্তার পাশাপাশি বলীখেলার দিন মেয়েকে নিয়ে জামাই বেড়াতে আসার কথাও পাকা করা হতো বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মক্কার বলী খেলা এখানকার মানুষের ইতিহাস ঐতিহ্যের অংশ। বলী খেলা উপলক্ষে আমাদের বাড়িতে সকল নিকট আত্মীয়-স্বজন বেড়াতে আসা অনেকটা নিয়মের মতো। আমরা সারা বছরের জন্য ব্যবহৃত বেশির ভাগ জিনিসপত্র মেলা থেকে সংগ্রহ করি। বলীখেলা উপলক্ষে বসা মেলায় বাঁশ-বেতের তৈরি হরেক রকম সামগ্রী, বিভিন্ন ধরে গ্রাম্য খাবার, ফল, কৃষি উপকরণ, বাচ্চাদের খেলনা, ঘর সাজানোর নানা রকম জিনিসসহ যাবতীয় সামগ্রী পাওয়া যায়।